হাত নেই, পায়ে চক-পেন ধরে লিখে শিক্ষকতা করলেও রথের রশি টানতে না পারায় আক্ষেপ জগন্নাথের

jagannath-bauri.jpg

স্কুলে ছাত্রছাত্রীদের পড়াচ্ছেন জগন্নাথ বাউড়ি — ফাইল চিত্র

প্রদীপ চট্টোপাধ্যায়, বর্ধমান: জন্মের সময় থেকেই দু’টি হাত নেই। সেই কারণে সাধ থাকলেও প্রভু জগন্নাথ দেবের রথের রশি টানতে পারেন না বিশেষ ভাবে সক্ষম জগন্নাথ বাউড়ি। পূর্ব বর্ধমানের আউশগ্রামের বাসিন্দা পেশায় শিক্ষক জগন্নাথ রথের দিন মহাপ্রভু-আরাধনায় অবশ্য ব্রতী হন। কিন্তু রথের রশি ধরতে না-পারায় বড় আক্ষেপ তাঁর।
আউশগ্রাম-১ ব্লকের বেরেন্ডা গ্রাম পঞ্চায়েতের বেলুটি গ্রামে বাড়ি বছর ৩৮-এর জগন্নাথ বাউড়ির। তিনিই বাড়ির বড় ছেলে। ছোট ভাইয়ের নাম বলরাম। জগন্নাথ জানান, জন্ম থেকে তাঁর দু’টি হাত নেই। সেই থেকেই তাঁদের গ্রামের লোকজন জগন্নাথ দেবের সঙ্গে তাঁর তুলনা করতে শুরু করেন।
এমনকী তাঁর বাবা লক্ষ্মণচন্দ্র বাউড়ি ও মা সুমিত্রা বাউড়িও মনে করতেন, প্রভু জগন্নাথ দেবের আশীর্বাদে একদিন তিনি ঠিকই নিজের পায়ে দাঁড়াবেন। তাঁকে স্কুলে ভর্তি করার জন্য শৈশবে বাবা নিয়ে যান বেলুটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। ওই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ভূতনাথ পাল তাঁর বাবাকে বলেন, প্রভু জগন্নাথ দেবকে স্মরণ করে তোমার ছেলের নাম রাখো জগন্নাথ। প্রধান শিক্ষকের সেই কথা মেনে নেন বাবা। সেই থেকে নাম জগন্নাথ বাউড়ি। ওই নামেই প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শুরু হয় তাঁর লেখাপড়া জীবন।
যুগ বদলের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বদলেছে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ধরন। কিন্তু বিশ্বাস ও ভক্তি ভাবে কোনও বদল আসেনি বাউড়ি পরিবারে। দিন আনা দিন খাওয়া বাউড়ি পরিবারের সকলে আজও সব কাজে তাই প্রভু জগন্নাথ দেবের প্রতি ভরসা রেখে চলেন।
এক সময়ে জগন্নাথের বাবা ও মা খেতমজুরি করে অনেক কষ্টে সংসার চালাতেন। জগন্নাথ জানান, তাঁর পা ধরে পায়ে পেন্সিল গুঁজে দিয়ে বাংলা ও ইংরেজি অক্ষর লেখা শিখিয়েছিলেন বেলুটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ভূতনাথ পাল। পায়ে করে লেখা শিখতে পারার পরেই তাঁর লেখাপড়া শেখার প্রতি আগ্রহ বেড়ে যায়।
এর পর শত কষ্টের মধ্যেও তিনি লেখাপড়া চালিয়ে যান। সাফল্যের সঙ্গে মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর তিনি ‘বেসিক ট্রেনিং’ কোর্সে ভর্তি হন। ট্রেনিং সম্পূর্ণ হওয়ার পর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতার চাকরি পান। গত প্রায় ১২ বছরেরও বেশি সময় ধরে আউশগ্রামের জয়কৃষ্ণপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছেন।
জগন্নাথ বলেন, ‘পায়ের আঙুলে চক পেন্সিল গুঁজে নিয়ে পায়ে করেই বোর্ডে লিখি। সেই ভাবে স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীদের পড়া বোঝাই। তা নিয়ে কোনও অবিভাবক বা পড়ুয়া আপত্তি তো তোলেইনি। বরং সকলে আমার এই প্রচেষ্টা বা জীবনের লড়াইকে সম্মান জানিয়েছেন। এটা আমার কাছে বড় প্রাপ্তি।’ স্কুলের সহকর্মী ছাত্র-ছাত্রীরাও সকলে তাদের প্রিয় জগন্নাথ স্যারের প্রশংসায় পঞ্চমুখ।
শিক্ষক জগন্নাথ তাঁর সংসার জীবনের দায়দায়িত্বও যথাযথ ভাবে পালন করছেন। স্ত্রী লক্ষ্মী, বাবা-মা-ভাই-বোন সকলকে নিয়ে এখন জগন্নাথের ভরা সংসার। রথযাত্রার দিনটিও ভক্তি সহকারে পালন করেন তাঁরা।
জগন্নাথ বাউড়ির আক্ষেপ, ‘প্রভু জগন্নাথ দেবের দু’টি হাত নেই। জন্মের পর থেকে আমারও দু’টি হাত নেই। তাই জ্ঞান হওয়ার পর থেকে প্রভু জগন্নাথ দেবকে আরাধ্য দেবতা বলে মেনে আসছি। সেই কারণেই প্রতি বছর রথযাত্রা উৎসবের দিনে প্রভু জগন্নাথ দেবের প্রার্থনা করি। তবে হাত নেই বলে রথের রশি টানতে পারি না। এ নিয়ে কষ্ট হয়। সাধ থাকলেও রথের রশি টানার বাসনা হয়তো আর পূরণ হবে না।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

scroll to top