৩০ মে-র সেই বিষণ্ণ সকাল, ঋতুপর্ণ ঘোষের স্মৃতিচারণে বিশিষ্ট সাংবাদিক অনিরুদ্ধ ধর

Rituparno-Ghosh.jpg

ইন্দ্রাণী পার্কের চেনা বাড়ি। কতবার এসেছি, কিন্তু এই ছোট্ট ঘরটায় আগে কখনও আসিনি। ঘরের তাপমাত্রা কত কে জানে! হিমাঙ্কের কাছাকাছি কি? রিনরিন করে দুটো এসি চলার শব্দ শুধু শোনা যাচ্ছে। আর কোনও শব্দ নেই। ঘরে দেওয়াল লাগোয়া একটা উঁচু খাট। সেই খাটে একটা কিংবা দুটো বালাপোষ শরীরে চাপিয়ে ঋতু ঘুমোচ্ছে। ঘরে আরও দু-তিন জন মানুষ। কেউ বিহ্বল, কেউ আকস্মিকতায় আচ্ছন্ন। কেউ মেঝেতে বসে, কেউ দেওয়ালে হেলান দিয়ে। আর ঋতু (Rituparno Ghosh) চুপচাপ শুয়ে। যেন খুব ভালো কোরিয়োগ্রাফড কোনও নির্বাক ছবির দৃশ্যের অভিনয় চলছে। কে একজন ধূপদানিতে খান কুড়ি জ্বলন্ত ধূপ ঘরে বসিয়ে গেলেন। সেই ধোঁয়া পাকিয়ে পাকিয়ে ঘর ঢেকে ফেলছে।
৩০ মে, ২০১৩-র সকালটা ছিল বিষণ্ণ। মেঘলা। যেন কিছু একটা ঘটে গিয়েছে বুঝতে পেরেছে প্রকৃতি। এই বাড়িতে যখন ঢুকি তখন বাড়ির বাইরে জনা কুড়ি-পঁচিশ মানুষ। আধ ঘণ্টা পরে বেরিয়ে আসার সময় সেই ভিড় অন্তত হাজার খানেক। ততক্ষণে কলকাতা জেনে গিয়েছে প্রয়াত হয়েছেন ঋতুপর্ণ ঘোষ (Rituparno Ghosh)।

পরিচালক ঋতুপর্ণ ঘোষ ও সাংবাদিক অনিরুদ্ধ ধর

‘নৌকাডুবি’ মুক্তি পেয়েছে। ‘একদিন’ পত্রিকার সাপ্লিমেন্ট ‘বায়োস্কোপ’-এ প্রায় পাতাজোড়া সেই ছবির আমার করা সমালোচনা। সেই সমালোচনার একটাই প্রতিপাদ্য। দৃশ্য তুলে তুলে প্রমাণ করা সত্যজিতের ‘অশনি সংকেত’ এবং ‘ঘরে বাইরে’-র কোন কোন ফ্রেম ঋতু হুবহু তুলে এনেছে ওর এই ছবিতে। এখন মনে নেই, প্লেজিয়ারিজম শব্দটা ব্যবহার করেছিলাম কি না। ঠিক আটটায় ঋতুর (Rituparno Ghosh) ফোন— ‘তোর লেখাটা পড়লাম। কাল সকালে আসতে পারবি?’ আমি জিজ্ঞেস করলাম, কেন? উত্তরে ও জানাল, ‘সিনেমায় নকল করা কাকে বলে তোকে বোঝাব।’ খানিক থেমে বলল, ‘লুচি আর কড়াইশুটি দিয়ে ফুলকপির তরকারিও খাওয়াব!’
পরের দিন আমি গিয়েছিলাম। চমৎকার চা সহযোগে লুচি-ফুলকপি খেতে খেতে জানাল ওর পরের ছবির বিষয়। সত্যজিতের ফ্রেম নকল করার বিষয় এল ঠিকই কিন্তু আমি ভুল বলেছি এটা জোর গলায় একটিবার বলেই প্রসঙ্গান্তর। বৃথা ওর সঙ্গে নতুন করে তর্ক করা। তাই চুপ করে গিয়েছিলাম। এর বিপরীতটাও ঘটেছে। ‘মেমরিজ ইন মার্চ’ ছবির ক্ষেত্রে। যদিও এটা সঞ্জয় নাগের সিনেমা, তাও এই ছবির সঙ্গে ওর একটা অন্য ভালোবাসা ছিল। সে প্রসঙ্গে পরে বলছি। সেই ছবির তিনটে ফ্রেমকে নিয়ে আমি সমালোচনা লিখেছিলাম। আমি লিখেছিলাম, ঠিক ঠিক লেন্স ব্যবহার করে শুধুমাত্র দৃশ্যের মাধ্যমে দু’টি চরিত্র (ঋতু আর দীপ্তি) যে ক্রমশ কাছাকাছি আসছে সেটা দেখিয়েছেন পরিচালক। আর একজন সমকামীর ভূমিকায় ঋতুর (Rituparno Ghosh) অভিনয়ের প্রশংসা করেছিলাম। এই রিভিউ পড়ে ঋতু বলেছিল, ‘একমাত্র তোর রিভিউটাই আজকাল পড়া যায়।’
এই দুটো ঘটনা থেকে আপাত দৃষ্টিতে ঋতুকে আর পাঁচজন ছবি করিয়ের মতোই বোঝা গেলেও আসলে কিন্তু একেবারেই তা নয়। আসলে ও ছিল ব্যতিক্রমী। সমালোচনায় অসন্তুতষ্ট, আর ভালো লিখলেই, তুই-ই সেরা বললেও ব্যবহারে অশালীন নয় এতটুকু, এমনকী অসম্মান করাও নয়। বরং উল্টে মানুষকে সম্মান করতেও দ্বিধা ছিল না। এমনকী সেই মানুষটি ওর কাজের কড়া সমালোচনা করলেও। ঋতুর এই গুণটি কেউ গ্রহণ করেননি। বরং ওর খারাপ গুণটা অনেকে নিয়েছেন। সেটা হল, এক সঙ্গে একাধিক ছবির কাজ করা। একটা শেষ হয়েছে কি হয়নি দ্বিতীয় কাজ শুরু। কখন যে ভাবেন তাঁরা কে জানে! বাংলা সিনেমায়
এই সংস্কৃতি একটা সময় ঋতুই এনেছে। আমি বলেছিলাম, তুই তো স্বপন সাহা নোস, তাহলে এই কাজটা করিস কেন? এত ক্রিয়েটিভ হওয়া কি সম্ভব একজন ফিল্মমেকারের? এতে সিনেমার কোয়ালিটি রাখা কি সম্ভব? উত্তরে ও বলেছিল, ‘দেখ, সেটা হয় আমি জানি। তবু এটা করি তার কারণ এটা না করলে সার্কুলেশনে থাকা যায় না।’ এর পরে আর কিছু বলাও যায় না।
ঋতুর সঙ্গে প্রথম দেখা ও যখন ‘হীরের আংটি’ ছবি দেখার আমন্ত্রণ জানাতে ‘সানন্দা’-র দপ্তরে এসেছিল। তখনই বুঝেছিলাম আমাদের সম্পাদক অপর্ণা সেনের সঙ্গে ওর সম্পর্কটা দিদি-ভাইয়ের। রিনাদি-র সমর্থন আর উপস্থিতি না থাকলে ‘উনিশে এপ্রিল’ সম্ভব হত কি না সন্দেহ আছে। ঋতুকে (Rituparno Ghosh) আমি প্রথম কাজের মধ্যে দেখি এই ছবির শুটিংয়ে। একটা কাঠের চেয়ারে এলোমেলো চুল নিয়ে বসে। সামনে একটা মনিটার। পাশে অপর্ণা একটা সিঙ্গল সোফায়। শট দিচ্ছেন। উল্টো দিকে ক্যামেরা। বোধহয় দেবশ্রী রায়ের সঙ্গে সিন হচ্ছে। অপর্ণার শটে দেবশ্রীর সংলাপের কিউ দিচ্ছে ঋতু নিজে। এই কাজটা সচরাচর করে থাকেন সহকারী পরিচালকেরা। কিন্তু এখানে সেই কাজটা পরিচালক নিজে করছেন। সে দিনই বোঝা গিয়েছিল এই মানুষটি ব্যতিক্রমী।
ঋতু (Rituparno Ghosh) যে ব্যতিক্রমী, এটার সবচেয়ে বড় প্রমাণ ছবি বানানোর কাজটাকে ও নিজের আত্মপরিচয় অনুসন্ধানের কাজে ব্যবহার করেছে। এই চেষ্টা আর কেউ অন্তত বাংলা সিনেমায় করেননি। ইন্দ্রাণী পার্কের দোতলার ঘরে চা খেতে খেতে ওর কথা শুনছিলাম। ও একটা পাতলা চাদর গায়ে দিয়ে বসেছিল। জানলাম ও সবে একটা সার্জারি করিয়ে এসেছে। শরীরের রূপান্তরের সেটা একটা গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়। বলছিল, ‘যে সব পুরুষদের মধ্যে মেয়েলি ভাব দেখা যায় তাদের আগে মগা বলত মানুষে। পরে যখন তারা শিখল এই সব মানুষদের যৌনতা অন্য রকম, তখন এদের বলতে শুরু করল হোমো। আর এখন এদের বলে ঋতুপর্ণ।’ আমি বলেছিলাম, তোর খারাপ লাগে না? উত্তরে ও বলেছিল, ‘আমি উপভোগ করি এটা। বিশ্বাস কর। আমার তখন মনে হয় আমি নিজের যে পরিচিতিটা তৈরি করতে চাই মনে মনে, এটা তার প্রথম সিঁড়ি।’


ক্যুয়ের শব্দটা ওর কাছে প্রথম শুনি। হেটেরোনরম্যাটিভ এবং হোমোনরম্যাটিভ-এর সীমারেখার মধ্যবর্তী এলাকায় যে সব বাইসেক্সুয়াল মানুষেরা থাকেন তাঁদের অনেকেই ছিলেন ঋতুর কাছের মানুষ। এই সব মানুষদের হিপোক্রেসি ওকে বিচলিত করত। কষ্টও দিত। সেই কষ্ট যে আমরা বুঝতে পারব না, সেটাও সেদিন বলেছিল। কেন আমাকে এত কথা বলেছিল আমি জানি না। এর অনেকটাই আমি একাধিক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলাম ‘একদিন’ পত্রিকায়। সেই কারণেই ও সম্ভবত কৌশিক গাঙ্গুলীর ‘আর একটি প্রেমের গল্প’ ছবিতে অভিনয় করতে রাজি হয়েছিল। বোঝাতে চেয়েছিল এই কষ্টটা।
‘এর পরে আমার মনে হয়েছিল মানুষ বোধহয় বোঝেনি। তাই মনে হল হেটেরোনরম্যাটিভ মানুষদের কাছে যেতে হবে আমাদের মতো হোমোরোনরম্যাটিভ মানুষদের। আমার এই কথা আমারই মতো অন্যেরা মেনে নিতে পারেনি সেই সময়। আমার সমালোচনা করেছিল। আমি সঞ্জয় নাগের ‘মেমরিজ ইন মার্চ’-এ এই কাছে আসার ব্যাপারটা আছে বলেই করেছি’, বলেছিল ঋতু। জানতে চেয়েছিলাম, এখন তুই কী ভাবছিস? আমার দিকে অদ্ভুত এক করুণ চোখে চেয়ে রইল। বলল, ‘আমি তোকে জানাব।’
বললাম, তুই নাচ জানিস, যে একজন নৃত্যশিল্পীর ভূমিকায় অভিনয় করবি? বাংলা সিনেমার এক জনপ্রিয় নায়কের নাম করে বলল, ‘ওর চেয়ে খারাপ অভিনয় আমি করি না রে!’ তারপর একটু থেমে বলল, ‘আসলে কী জানিস আমি নর্তকীদের নাচ ছাড়া অন্য সময়ে তাদের হাবভাব, ভঙ্গি সে সব নকল করছি। দেখবি ওরা অন্য ভাবে বসে, হাঁটে। আর তাছাড়া আমি নাচ শিখছি তো।’ জিজ্ঞেস করলাম, পারবি? ও দ্রুত পায়ে ঘুঙুর বেঁধে আমাকে নাচ দেখাতে শুরু করল। আমি বললাম, তুই কেন এই সব করছিস? ও রেগে বলেছিল, ‘কী করছি আমি মানে? তুই কী বলতে চাস?’ ‘চিত্রাঙ্গদা’ রিলিজ করার পর আমি জানতে চেয়েছিলাম, তোর মিশন কি এ বার কমপ্লিট? নাকি এর পরেও আছে? উত্তরে আমাকে বলেছিল, ‘ছবিটা নিয়ে তোর লেখাটা পড়লাম। ভালই তো লিখেছিস।’ আর অন্য কোনও কথা বলেনি সে প্রসঙ্গে।
শেষের দিকে ও কথা বলার জন্য একটা ঘর তৈরি করেছিল। যে ঘরের দেওয়াল জুড়ে রয়েছে ওর প্রতিটা ছবির নায়িকারা ফ্রেমে বাঁধানো অবস্থায়। এই ঘরে বসেই ‘রবীন্দ্রনাথ’ তথ্যচিত্র দেখেছি। আর শেষ সাক্ষাৎকারটাও নিয়েছি। তখন নন্দন-এ ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল চলছে। হঠাৎই ‘এই সময়’ কাগজের ‘অন্য সময়’ সাপ্লিমেন্টের সম্পাদক সুদীপ ঘোষ ফোনে জানালেন, ঋতুপর্ণ (Rituparno Ghosh) নাকি ব্যোমকেশ করছে। কালকেই স্টোরি চাই। ফোন করলাম ঋতুকে। বলল, ‘কাল সকালে আয়।’ পরের দিন সকালে ওর বাড়ি। আমার সঙ্গে সহকর্মী অভিষ্যন্দা লাহিড়ি। বাংলা সাহিত্য নিয়ে পড়া মেয়ে। কোনও জটিল প্রশ্ন এলে যাতে ম্যানেজ করার কেউ থাকে, এই ভরসাতেই ওকে সঙ্গী করা। ঋতু অবশ্য শুরুতেই টানা বলে গেল আজ পর্যন্ত যাঁরা ব্যোমকেশ বানিয়েছেন, তাঁরা কেউই শরদিন্দুকে বুঝতে পারেননি। এমনকী সত্যজিৎ রায়ও। শরদিন্দুর কাহিনিতে রহস্য উদ্ঘাটনে আসত পুরাণ, রামায়ণ, মহাভারতের নানা অনুরঙ্গ। সে সব কেউই বুঝতে পারেননি। ফলে কোনও ব্যোমকেশ-ই দাঁড়ায়নি। ইতিমধ্যে ক্যুরিয়ার দিয়ে গেল অর্ডার করা একরাশ বই। সে সব দেখছে আর কী ভাবে শরদিন্দু এইসব সূত্রগুলো ছড়িয়ে রেখেছেন তাঁর গল্পে সেসব আরও বিস্তারিত ভাবে বলা যাচ্ছে। আমি ওকে থামিয়ে দিয়ে বললাম, ব্যোমকেশ কে হচ্ছেন? ও আমার দিকে অদ্ভুত ভাবে তাকিয়ে রইল খানিকক্ষণ। বলল, ‘তুই এটা জানতেই এসেছিস, আগে বললেই পারতিস। এতক্ষণ বাজে বকতাম না।’ তারপর বলল, ‘ধর সুজয় ঘোষ যদি ব্যোমকেশ হয়, আর অজিত হয় সুমন ঘোষ, তবে কেমন লাগবে?’
আমি বললাম, খুব খারাপ লাগবে। দু’জনেই নন-অভিনেতা। সুজয় চললেও, সুমন চলবে না। জানতে চাইল, ‘কেন?’ আমি বললাম, দু’জনেই একসঙ্গে এক ফ্রেমে বহুক্ষণ থাকবে। তাই দু’জনের মুখ গোল হওয়ায় বোরডম আসতে পারে। গুপি-বাঘা বা ফেলু-জটায়ুর মধ্যে কন্ট্রাস্ট আছে বলেই জমে গিয়েছে। সুমনের বদলে এমন কাউকে নে যার মুখ লম্বাটে। ও মন দিয়ে শুনল। আমি বললাম, কোন গল্প? ও বলল, ‘তোকে বেছে নিতে হবে একটা। হয় লিখবি কে ব্যোমকেশ, নয়তো লিখবি কোন গল্প।’ আমি বললাম ঠিক আছে। আমি লিখব কোন গল্প। বলল, ‘চোরাবালি।’ সেটাই ওর সঙ্গে শেষ দেখা। তবে এর পরে টেলিফোনে কথা হয়েছে। আমার লেখা প্রকাশিত হওয়ার পর ও জানাল কোনওদিন ও আমাকে আর কোনও সাক্ষাৎকার দেবে না। কারণ, আমি শুধু চোরাবালি নামটা লিখিনি, কী ভাবে বলবন্তপুর নাম থেকে বালির বাঁধ এবং চোরাবালি ব্যাপারটা ব্যোমকেশ বের করল এই ক্লু-টাও লিখে ফেলেছিলাম। আমি বললাম, ভুল হয়ে গিয়েছে। ও ফোন কেটে দিয়েছিল। সেটাই ওর সঙ্গে আমার শেষ কথা।
৩০ মে। ২০১৩। বৃস্পতিবার। বৃষ্টির মধ্যেই ঋতুর (Rituparno Ghosh) শরীর কাচের বাক্সের মধ্যে করে নন্দন এসেছিল। মানুষ তাকে শ্রদ্ধা জানাতে ভিড় করে এসেছিলেন। তখনও ঋতুর শেষ ছবি কে, কী ভাবে সম্পাদনা করবে, মিউজিক লাগানো হবে কার নির্দেশে কিছুই ঠিক হয়নি। তবু ঋতুর সমস্ত সহকর্মীরা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ছবি শেষ করেছিলেন। একজন পরিচালকের প্রতি সহকর্মীদের এর চেয়ে বড় ট্রিবিউট আর কী হতে পারে?

Theonlooker24x7.com সব খবরের নিয়মিত আপডেট পেতে লাইক করুন ফেসবুক পেজ  ফলো করুন টুইটার

Leave a Reply

Your email address will not be published.

scroll to top