আয়ের বিকল্প পথে কর্মমুখী করে তুলতে হবে সুন্দরবনবাসীকে। কলম ধরলেন প্রখ্যাত পর্বোতারোহী দেবাশিস বিশ্বাস। তৃতীয় পর্ব

SUNDARBAN.jpg

সেই প্রাচীন কাল থেকে একের পর এক বিপর্যয় কাটিয়ে উঠেছে সুন্দরবন। বিপর্যয়ের ধারা আজও অব্যাহত। তবে মোকাবিলার ক্ষেত্রে এখন অনেক অসহায় সুন্দরবনের মানুষ। তার জন্য দায়ী কারা? বিশ্লেষণে অর্জুন পুরস্কার প্রাপ্ত এভারেস্ট জয়ী পর্বোতারোহী তথা পরিবেশপ্রেমী দেবাশিস বিশ্বাস (তৃতীয় পর্ব)

পুকুরগুলিকে মাছ চাষের উপযোগী করে তোলার মতো একই ভাবে ওই এলাকার গবাদিপশু পালনের ব্যাপারটাও খেয়াল রাখতে হবে। এমন না যে মাঠে ছেড়ে দিলে শুধু ঘাস কিংবা পাতা খেলেই একটা গোরুর পরিপূর্ণ দুধ হবে, এ ছাড়া আর কোনও উপায় নেই তার দুধ বাড়ানোর। কিন্তু গবাদিপশু পালনও যে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে করা যায় সেটাও জানতে হবে। সেই গোরু ছাগলকে কী ভাবে খাবার দিলে তার থেকে সবথেকে বেশি পরিমাণে উৎপাদন পাওয়া যেতে পারে, সেই ব্যবহারিক প্রয়োগগুলো শেখানোর দরকার। সে ক্ষেত্রে দেখা যাবে গোরু ছাগলকে ঠিক পরিমাণে অন্য খাবার দিলে তারা এই ম্যানগ্রোভ গাছগুলোর উপরে হামলা করবে না। সেই গাছগুলো বেঁচে যাবে। শুধু ম্যানগ্রোভ নয়, এছাড়াও বিভিন্ন গাছ, যেমন শিরীষ কিংবা অন্যান্য ফলের গাছ সেগুলো গবাদিপশুর হাত থেকে বাঁচাতে গেলে সেই এলাকার বাসিন্দাদের শেখাতে হবে গাছ বাঁচিয়ে কী ভাবে সেই গবাদিপশু পালন করতে হয়। একই সঙ্গে এক একটা গ্রাম ধরে শেখাতে হবে ওঁদের। কী ভাবে তাঁদের জীবন-জীবিকা পরিপূর্ণ ভাবে সুন্দর ভাবে করা যায়, যাতে তাঁরা অন্য দিকে আকৃষ্ট না হন। কারণ হঠাৎ করে গিয়ে যদি বলা হয়, ভেড়ির চাষ আপনারা আর করবেন না, এতে আপনাদের ভবিষ্যতে ক্ষতি হবে; ১০ বছর, ১৫ বছর বা ২০ বছর বাদে সুন্দরবন আর থাকবে না। ওঁদের মাথায় তো খুব স্বাভাবিক ভাবেই আসবে, ১৫ বছর বাদে কি হবে তার জন্য আমি এখনই কেন ভাবব? আগে এই ১৫ বছর আমি সংসারের সবাইকে নিয়ে খেতে পাব, সুস্থ থাকব, বেঁচে থাকব, তবেই তো ১৫ বছর বাদের কথা ভাবব। কারণ তাঁর সেই জমি ভেরির মালিককে দিলে দেখা যাচ্ছে বছরে ন্যূনতম সাত-আট হাজার টাকা পাচ্ছেন সেই জমি থেকে। যেখানে ধান চাষ করে, নিজে গায়ে গতরে খেটে সেই জমি থেকে খুব বেশি হলে তাঁর চার থেকে পাঁচ হাজার টাকা লাভ থাকে।
এই পরিস্থিতিতে তাঁকে কোনও বুদ্ধি দিতে গেলে তিনি তো প্রথমেই বলবেন, রাখো তোমার এইসব বড় বড় কথা। আমি তো জমি দিয়ে বসে বসেই ১০,০০০ টাকা পেয়ে যাচ্ছি। তাহলে আমি কেন অত খাটতে যাব? তার উপর ওই গোরুর খাটুনির পর হাতে তেমন কোনও টাকাও পাব না। সে জন্যই হয়তো তাঁরা সারাদিন তাস খেলে কিংবা বিনা কাজে দিন কাটাচ্ছেন। কারণ তাঁরা দেখতে পাচ্ছেন এটাই তাঁদের আরামের জীবন। অহেতুক কেন খাটাখাটনি করে সেই একই সময়ে তার থেকে অনেক টাকা কম আয় করবেন? এই যে তাস খেলছেন, ঘুরে বেড়াচ্ছেন এবং বসে বসে টাকা ইনকাম হচ্ছে এই সহজ জীবনটা যে আসলে সহজ নয়, ভবিষ্যতে এটাই কঠিন হয়ে বুমেরাং হয়ে ফিরে আসবে, এটা যে ভবিষ্যতের জন্য ক্ষতিকারক, এটা যে শুধুমাত্র ওই ১০ হাজার টাকা আয়ের সরল এক হিসাব নয়, এ ভাবে তার স্বাধীনতা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, ওই জমির ভবিষ্যত নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, সেটা ওদের বোঝাতে হবে।
পাশাপাশি ওঁদেরকে সেই পথগুলো দেখাতে হবে যাতে সেই একই জমি থেকে সে অন্তত দশ হাজার টাকা কিংবা তার বেশি আয় করতে পারেন। তবেই তো সে উৎসাহ পাবেন নিজের কাজে। এ ভাবে বোঝাতে হবে সে যদি নিজের জমিতে ধান চাষ করেন, তাঁর সারা জীবন ধান চাল কিনতে হচ্ছে না। চাষের পাশাপাশি সেই জমির আলে যদি কয়েকটা পুঁইশাক বা কুমড়ো গাছ লাগান, যেগুলো সাধারণত খুব কম আয়েশেই হতে পারে, তাহলে তাঁকে বাজার থেকে বেশি সব্জিও কিনতে হচ্ছে না। আর যদি সেই আলের ঢাল দিয়ে কচা জাতীয় বিভিন্ন রকম বেড়ার গাছগুলো লাগিয়ে দেন, সেই গাছের ডালপালা দিয়ে তাঁর জ্বালানির সাশ্রয় হবে, তাঁকে গ্যাস কিনতে হবে না। একটা গ্যাস যদি দু’মাস চলে তাহলে সেই আটশো-হাজার টাকার সাশ্রয় হবে সে ভাবে। এ ভাবেই যদি তাঁর জমি ভেরিকে না দিয়ে নিজে বিভিন্ন প্রকারে ব্যবহার করার চেষ্টা করেন তাহলে চাষের পাশাপাশি তাঁর অন্যান্য আয় কিংবা খরচ সাশ্রয় হতে পারে। এই হিসাবগুলো বোঝাতে হবে। (চলবে)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

scroll to top