সুন্দরবন বাঁচাতে ত্রাণের চেয়েও অনেক বেশি প্রয়োজন সমস্যার শিকড়ে পৌঁছনো। কলম ধরলেন প্রখ্যাত পর্বোতারোহী দেবাশিস বিশ্বাস। দ্বিতীয় পর্ব

sundarban-cyclone.jpg

বিপর্যয়ের পর ভঙ্গুর বাঁধ মেরামতির চেষ্টা স্থানীয় বাসিন্দাদের

সেই প্রাচীন কাল থেকে একের পর এক বিপর্যয় কাটিয়ে উঠেছে সুন্দরবন। বিপর্যয়ের ধারা আজও অব্যাহত। তবে মোকাবিলার ক্ষেত্রে এখন অনেক অসহায় সুন্দরবনের মানুষ। তার জন্য দায়ী কারা? বিশ্লেষণে অর্জুন পুরস্কার প্রাপ্ত এভারেস্ট জয়ী পর্বোতারোহী তথা পরিবেশপ্রেমী দেবাশিস বিশ্বাস (দ্বিতীয় পর্ব)

বর্তমানে সুন্দরবনকে বাঁচাতে গেলে ত্রাণ চাই, কিন্তু তার চেয়েও বেশি প্রয়োজন নদী বাঁধ মেরামত ও যথোপযুক্ত রক্ষণাবেক্ষণ। সঙ্গে বৃক্ষরোপণ। নদী বাঁধের বাইরের দিকে ম্যানগ্রোভ এবং লোকালয়ের দিকে অন্যান্য বড় গাছ। গাছগুলো শুধু লাগালেই হবে না, ম্যানগ্রোভ গাছ গোরু-ছাগলের খুব প্রিয় খাদ্য। গাছগুলোকে লাগানোর পর অন্তত তিন-চার বছর সুন্দর ভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করা আবশ্যক, যাতে গাছগুলো গোরু-ছাগলের নাগালের উপরে উঠে যেতে পারে। ম্যানগ্রোভ শুধু সুন্দরবনকেই বাঁচায় না, বর্তমানে আমরা জেনে গেছি প্রতিটা ঝড়ের দাপট প্রথমেই রুখে দেয় এই ম্যানগ্রোভের জঙ্গল। ম্যানগ্রোভ জঙ্গল রয়েছে বলেই সামুদ্রিক ঝড়ের দাপট থেকে কলকাতা তথা বাংলা অনেকটাই সুরক্ষিত। এখনই যদি এ ব্যাপারে উপযুক্ত ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তবে অদূর ভবিষ্যতে ঝড়ের দাপটে শুধুমাত্র সুন্দরবনই ভাসবে না, হয়তো আরও উত্তরে ধেয়ে আসবে সেই নোনা জলের ঢেউ। এমন আশঙ্কাও অমূলক নয় যে সেই জলস্তর একদিন দক্ষিণ ২৪ পরগনা ভাসিয়ে পৌঁছে যাবে আমাদের এই সাধের তিলোত্তমা কলকাতার বুকে।
নদী বাঁধ ভাঙা এবং ম্যানগ্রোভ হারিয়ে যাওয়ার আরএকটি কারণ ইট ভাটা। ওই অঞ্চলে বিভিন্ন নদীর মাঝে মাঝে পলি জমে প্রাকৃতিক চর তৈরি হয়। চরের সেই মাটি ইট তৈরির মূল উপাদান। ইটের প্রয়োজনে ভাটা মালিকেরা নদীচর থেকে পলি তুলে আনেন। সেই ইট বিভিন্ন জায়গায় সাপ্লাই হয়। বেশি লাভের আশায় যথেচ্ছ ভাবে পলি কেটে নেন তাঁরা। এ ভাবেই যে এলাকায় ভাটা রয়েছে সেই এলাকার চরগুলো পুরোপুরি কেটে তুলে আনা হয় ইট তৈরির উদ্দেশ্যে। এই সব পলির চরে ম্যানগ্রোভ গাছ প্রচুর পরিমাণে জন্মায়। কিন্তু চরগুলো কেটে নেওয়ার জন্য সেখানে ম্যানগ্রোভ জন্মানোর সুযোগ থাকে না। চরের ম্যানগ্রোভ জঙ্গল জলের ধাক্কা থেকে নদী বাঁধকে অনেকটা সামলে রাখতে পারে। চর কেটে নেওয়ার ফলে ম্যানগ্রোভ গাছ না জন্মানোর জন্য কাছাকাছি নদী বাঁধ মারাত্মক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
পলি সংগ্রহ করার আর এক পদ্ধতি হল বিভিন্ন জায়গায় বড় বড় গোলাকার গর্ত কেটে অর্থাৎ রিং তৈরি করে সেখানে নদীর জল ঢুকিয়ে সেই গর্তে ধীরে ধীরে নদীর পলি জমানো হয়। দিনে দিনে সেই জমা পলি দিয়ে গর্ত ভর্তি হয়ে গেলে সেই পলি কেটে তুলে ইট তৈরি করা হয়। ফের নদীর জল ঢুকিয়ে সেখানে পলি জমা, এই ভাবেই চলতে থাকে।
যদিও সুপ্রিম কোর্টের রায় অনুযায়ী বর্তমানে মাটি কেটে ইট তৈরি করা নিষেধ, কিন্তু সেই নিয়মের কোনও তোয়াক্কাই করেন না এঁরা। বিদ্যাধরী নদী এবং অন্যান্য নদীর পাশ দিয়ে যত ইটভাটা আছে, তার প্রায় সবই অবৈধ। আর সাধারণ বাসিন্দারা তাঁদের জমি ইটভাটা কিংবা ভেড়ির মালিকদের হাতে তুলে দিচ্ছেন, বা গাছ কাটছেন, হরিণ বা অন্যান্য প্রাণী মারছেন, কিংবা বিভিন্ন ভাবে আয়ের আশায় জঙ্গলের দিকে অন্যায় ভাবে প্রবেশ করছেন, তার প্রধান কারণ হচ্ছে তাঁদের নিজেদের জীবিকার অভাব। তাঁদের নিজস্ব জীবিকা আস্তে আস্তে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। সেই নষ্ট হওয়া জীবিকাগুলো বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে সফল ভাবে প্রয়োগ তাঁদের শিখিয়ে সেই জীবিকাতে তাঁদের উৎসাহিত করতে হবে। সুন্দরবনের নোনা এলাকার জমিতে কিন্তু বছরে তিন-চারবার ফসল কোনও দিনই হয় না। অন্যান্য জেলার তুলনায় এখানে ধান চাষ হয় কম। যে সব ধানগুলো নোনা জলে ভালো চাষ হয় সেখানেও সেই নোনাজলের ধান খুব অর্থকরী শস্য নয়। সেখানে এর পাশাপাশি আর কি কি উপায়ে নতুন নতুন জীবিকা তৈরি করা যায়, সেটা নিয়ে ভাবতে হবে। বিভিন্ন রকম চাষ কী ভাবে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে আরও ভালো ভাবে করা যায় সে দিকে খেয়াল রাখতে হবে। এলাকার লোকেদের সুন্দর ভাবে শেখাতে হবে সে সব। ধান ছাড়াও শেখাতে হবে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে মাছ চাষ, সব্জি চাষ, মধু চাষ ও তার বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে প্রসেসিং। খুব অল্প সময়েই শেখানো যায় জলের লবণের পরিমাণ কী ভাবে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে মাপা যায়, কিংবা কোনও পুকুরের অপরিস্রুত জলে কতটা চুন-ফিটকারি মেশালে তা পরিস্রুত হবে। এসব কাজের জন্য প্রয়োজনীয় মেশিন বেশ সহজলভ্য। স্যালিনিটি মেজারমেন্ট আর pH মেজারমেন্ট ইন্সট্রুমেন্ট এর দাম সব মিলিয়ে সাধারণের নাগালের মধ্যেই। এবং এটাও প্রত্যেক চাষির আলাদা আলাদা করে কেনার প্রয়োজন নেই, সমস্ত গ্রামের জন্য একটা সেট কিনে নিলেই ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে গ্রামের সবাই সেটা ব্যবহার করতে পারবেন। সেটা দিয়ে গ্রামের সবার প্রয়োজন মেটানো সম্ভব। এ ভাবে খুব অল্প খরচেই সবাই বুঝে যাবেন তাঁর জমির লবণাক্ত ভাব কিংবা পুকুরে লবণাক্ত ভাব।
সাধারণত একটা পাঁচ কাঠার পুকুরে ৫ কিলো ফিটকিরি এবং তার দ্বিগুণ মাপের চুন ব্যবহার করা হয়। অর্থাৎ প্রতি কাঠায় এক কিলো। তবে এমন না যে সমস্ত জায়গার পুকুরের জল পরিস্রুত করার জন্য একই মাপের চুন-ফিটকিরি ব্যবহার হবে। এমন করলে কোন কোন ক্ষেত্রে হিতে বিপরীত হওয়ার সম্ভাবনা থাকতে পারে। খুব সহজেই এই শিক্ষাগুলো এলাকার লোকেদের দেওয়া যায় – কোন জলে কতটা চুন দেওয়া দরকার, কতটা ফিটকারি মেশালে জলটা মাছ চাষের উপযোগী হবে। চাষের উন্নতির জন্য এই প্রাথমিক প্রশিক্ষণগুলো প্রথমেই দেওয়া দরকার। পুকুরের জলের স্বভাব সঠিক না জেনেই নিজের মর্জি মতো কিছু চুন কিংবা ফিটকিরি পুকুরে ঢেলে দিলে তাতে উপকারের বদল অপকার হওয়ার সম্ভাবনা রয়ে যায়। সেক্ষেত্রে সেই একই পুকুরে পরবর্তী দু-তিন বছর হয়তো মিষ্টি জলের মাছের চাষ হবে কিন্তু যতটা পরিমাণে পাওয়ার কথা হয়তো দেখা যাবে পাওয়া যাচ্ছে তার থেকে অনেক কম। কোনও কোনও ক্ষেত্রে অর্ধেকেরও কম হতে পারে উৎপাদন। (চলবে)

Theonlooker24x7.com সব খবরের নিয়মিত আপডেট পেতে লাইক করুন ফেসবুক পেজ  ফলো করুন টুইটার

Leave a Reply

Your email address will not be published.

scroll to top