সুন্দরবন— বিপর্যয়, মোকাবিলা এবং ত্রাণের হিড়িক। কলম ধরলেন প্রখ্যাত পর্বোতারোহী দেবাশিস বিশ্বাস। প্রথম পর্ব

yaas-cyclone-sundarban.jpg
সেই প্রাচীন কাল থেকে একের পর এক বিপর্যয় কাটিয়ে উঠেছে সুন্দরবন। বিপর্যয়ের ধারা আজও অব্যাহত। তবে মোকাবিলার ক্ষেত্রে এখন অনেক অসহায় সুন্দরবনের মানুষ। তার জন্য দায়ী কারা? বিশ্লেষণে অর্জুন পুরস্কার প্রাপ্ত এভারেস্ট জয়ী পর্বোতারোহী তথা পরিবেশপ্রেমী দেবাশিস বিশ্বাস (প্রথম পর্ব)
সুন্দরবনে প্রায় প্রতিবছরই একাধিক সাইক্লোন এসে আছড়ে পড়ছে। আর তার পর পরই শুরু হয়ে যাচ্ছে ত্রাণ দেওয়ার হিড়িক। সরকারি স্তরে কিংবা বেসরকারি ছোট-বড় উদ্যোগে যে যার মতো পারছেন ত্রাণ নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ছেন সুন্দরবনের মানুষদের উপকারের জন্য। কিন্তু এটাও তো ভেবে দেখার বিষয় যে এ ভাবে দিনের পর দিন ত্রাণ পাঠিয়ে তাঁদের আখেরে কোনও উপকার হচ্ছে কি না? এই বিস্তীর্ণ এলাকার লোকজনকে আমরা ক্রমশ ‘ভিখারি’ বানানোর দিকে নিয়ে যাচ্ছি না তো?
আমি নিজের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় দেখেছি ওখানকার লোকেরা এমন কোনও দুর্যোগের পর পরই ত্রাণ পাবার আশায় সকালবেলাতেই থলি হাতে এসে দাঁড়িয়ে পড়ছেন বিভিন্ন খেয়া ঘাটে। যদি কিছু পাওয়া যায় এই আশায়। সেই দলে যেমন বয়স্ক নারী পুরুষ রয়েছেন, ঠিক তেমনি থাকছে খুদেরাও। এই খুদেদের কি ছোটবেলা থেকে অজান্তেই আমরা ভিক্ষাবৃত্তি শেখাতে বাধ্য করছি না? এটা অবশ্যই একটা চিন্তার বিষয়। এটা এখন ওই এলাকার এক সামাজিক ব্যাধিও বটে। শুধুমাত্র ত্রাণ দিলে তাঁদের সমস্যার হয়তো সাময়িক এক-দু’দিনের সুরাহা হতে পারে কিন্তু সেটা কোনও ভাবেই সুন্দরবনের বাসিন্দাদের সমস্যার স্থায়ী সমাধান হতে পারে না।
দেখা গিয়েছে, এঁদের সমস্যার মূল সেখানকার ভঙ্গুর নদী বাঁধ। সব জায়গাতেই নদী বাঁধ বানানো রয়েছে, কিন্তু বহু জায়গায় তা ভেঙে গিয়েছে, তার যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ হচ্ছে না। সেই বাঁধ ঠিকমতো মেরামত করা হলে আর তার যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ হলে ঝড়ের ধাক্কা অনেকটাই সামলানো যাবে। আর এই নদী বাঁধের প্রধান সাপোর্ট সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ জঙ্গল। কিন্তু গত কয়েক দশক ধরে যথেচ্ছ ভাবে কাটা হয়েছে ম্যানগ্রোভ। এখন সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকায় গেলে যতদূর চোখ যায় দেখা যাবে শুধু ভেরি আর ভেরি। বহু দূর দূরান্ত পর্যন্ত একটা বড় গাছ চোখে পড়বে না, এ যেন জলাশয়ের বিস্তীর্ণ এক মরুভূমি। যেখানে প্রচুর জল রয়েছে বটে কিন্তু নেই কোনও সবুজের চিহ্ন। সুন্দরবন নামে রয়েছে বন, কিন্তু সুন্দরবনের বহু এলাকায় বর্তমানে বন তো দূরের কথা পাশাপাশি চারটে বড় গাছ খুঁজে পাওয়াই বেশ কঠিন।
সুন্দরবনকে বাঁচাতে প্রথম কাজ এই নদী বাঁধ সুন্দর ভাবে তৈরি করে তার রক্ষণাবেক্ষণ। সাথে নদীবাঁধ বরাবর দু’পাশেই বড় গাছের ঢাল, যা প্রতি বছরের ঝড়ের প্রকোপ থেকে রক্ষা করবে নদী বাঁধকে। এই নদী বাঁধ কংক্রিট করার যে দাবি উঠছে সেটা অবশ্যই খুব ভালো, কিন্তু এটা ভেবে দেখা যেতে পারে বিগত শত বছর ধরে মাটির নদী বাঁধই রক্ষা করে রেখেছিল সুন্দরবনকে। এমন তো নয় যে গত ১০০ বছরে কোনও ঝড় এসে আছড়ে পড়েনি সুন্দরবনের উপর। কিন্তু সুন্দরবনের লোকেরা মাটির বাঁধ দিয়েই ঠেকিয়ে রাখতে পেরেছিলেন ঝড়ের সেই দাপট। সুতরাং কংক্রিট নদী বাঁধ তৈরি করা গেলে সেটা অবশ্যই খুব ভালো কাজই হবে, কিন্তু যতক্ষণ না সেটা হচ্ছে এই মাটির নদী বাঁধ দিয়েই কিন্তু সুন্দরবনের মানুষ ঝড়কে ঠেকিয়ে রাখতে পারবেন, যদি তার সাথে সাথে ম্যানগ্রোভ জঙ্গলের দুর্ভেদ্য ঢাল তাঁরা তৈরি করতে পারেন। পাশাপাশি নদী বাঁধটাকে সুন্দর ভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করতে পারেন। আর কংক্রিট বাঁধ একবার বানিয়ে ফেললে সেটাও যে আজীবন টিকবে, তারও কোনও নিশ্চয়তা কিন্তু নেই। সেই কংক্রিট বাঁধকে বাঁচাতে গেলেও তার দু’পাশে (নদীর দিকে এবং লোকালয়ের দিকে) গাছের ঢাল থাকলে তবেই সেই বাঁধ বহু বছর টিকে থাকার সম্ভাবনা। না হলে নোনা জলের ধাক্কায় আর ঝড়ের দাপটে কংক্রিট বাঁধের অবস্থা হবে বর্তমান মাটির বাঁধের মতো, হয়তো দু-এক বছর আগে বা পরে।
দেখা গিয়েছে, ভেরি মালিকেরা বিভিন্ন জায়গায় নদী বাঁধ কেটে নোনা জল ঢুকিয়ে নিচ্ছেন তাঁদের মাছ চাষের লাভের জন্য। কিন্তু এতে ক্ষতি হচ্ছে সেই জমির। সেখানে বেড়ে যাচ্ছে লবণের প্রভাব। লবণাক্ত জমিতে অন্যান্য বড় গাছ আর হচ্ছে না। চাষবাস হচ্ছে না। যে মিষ্টি জলের পুকুরগুলোতে মিষ্টি জলের মাছের চাষ হত, সেখানে নোনা জল ঢুকে যাওয়াতে মিষ্টি জলের মাছ চাষ করা সম্ভব হচ্ছে না। সেই জায়গাগুলো থেকে প্রথমেই নোনাজল বাইরে বের করে দিতে হবে। এটা খুব বড় কাজ না। নদী বাঁধের মাঝে মাঝে কিছু গেট বানানো রয়েছে। ভাটার সময় যখন নদীর জলস্তর লোকালয় থেকে নীচে নেমে যায়, তখন ভিতরের নোনাজল সেই গেট দিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসতে পারে। সেই গেটের একমুখী ভাল্ভ এমন ভাবেই বানানো যাতে জোয়ারের সময় যখন নদীর জলস্তর বেড়ে যায় সেই জল ভিতরে ঢুকতে পারে না। সুন্দরবনে আবহমান কাল ধরে এ ভাবেই বন্যার নোনা জল স্বাভাবিক নিয়মেই বাইরে বেরিয়ে এসেছে। এটা কোনও রকেট সায়েন্স না, এ ভাবে খুব সহজেই ভিতরের জল বাইরে বের করে দেওয়া যায়। আর সঙ্গে দু-একবার বৃষ্টি হলে, বৃষ্টির জল মাটির লবণাক্ততা ধুইয়ে বাইরের নদীতে ফেলে দিতে পারে। অর্থাৎ প্রাকৃতিক উপায়েই ধীরে ধীরে জমির লবণাক্ত ভাব দূর করা সম্ভব।
কিন্তু বর্তমানে দেখা যাচ্ছে, শেষ সাইক্লোন চলে যাবার মাসখানেক পার হয়ে যাওয়ার পরেও চাষের জমির নোনা জল সরেনি। বরং হচ্ছে উল্টোটাই। বাইরের জোয়ারের জল নিয়মিত ভিতরে ঢুকে আসছে অথচ ভাটার সময় জমির লবণাক্ত জল নদীতে গিয়ে পড়ছে না। গেটগুলো কেন উল্টো আচরণ করছে সেটা বুঝতে গেলে এলাকার দু-এক জনের সঙ্গে কথা বললেই বোঝা যাবে। এর সঙ্গে বহু ভেরি মালিকের ব্যক্তিগত লাভ-লোকসান জড়িয়ে। (চলবে)

Theonlooker24x7.com সব খবরের নিয়মিত আপডেট পেতে লাইক করুন ফেসবুক পেজ  ফলো করুন টুইটার

Leave a Reply

Your email address will not be published.

scroll to top