অগ্নিমূল্যের বাজারেও ১ টাকায় চপ বিক্রি করে বিত্তশালী! বর্ধমানের এই চপ বিক্রেতার সাফল্য শুনলে চোখ কপালে উঠবে

chop-seller-sells-chops-at-Re-1.jpg

নিজের দোকানে চপ ভাজছেন হিমাংশু — প্রতিবেদক

প্রদীপ চট্টোপাধ্যায়, জামালপুর (পূর্ব বর্ধমান)

অতিমারীর মধ্যে জ্বালানির আঁচে জ্বলছে গোটা দেশ। শুধু পেট্রোপণ্য নয়, ভোজ্য তেল থেকে সব কিছুই এখন অগ্নিমূল্য। কিন্তু তাত কী! এ সব নিয়ে বিশেষ মাথা ঘামাতে চান না পূর্ব বর্ধমানের জামালপুরের পাঁচড়ার তেলেভাজা বিক্রেতা হিমাংশু সেন। বরং তাঁর হিসেব বলছে কঠিন এই পরিস্থিতির মধ্যেও ষোলো আনা অর্থাৎ ১ টাকা পিস হিসেবে চপ বিক্রি করেও বিত্তশালী হওয়া যায়। শুধু মুখের হিসেব নয়, বাস্তবেও তা করে দেখাচ্ছেন তিনি। আর হিমাংশুর কর্মকাণ্ডে অনেকে ষোলো আনায় চপ কিনে খেতে খেতে বলছেন, ‘চপ শিল্প’ নিয়ে যে যতই কটাক্ষ করুক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কিন্তু হক কথাই বলেছিলেন। যাঁরা কটাক্ষ করেছিলেন, তাঁরা বরং হিমাংশুর দোকানে চপ খেয়ে তাঁর বাড়িঘরটা একবার ঘুরে যেতে পারেন।
জামালপুরের পাঁচড়া গ্রামের দক্ষিণপাড়ার বাসিন্দা হিমাংশু। বাড়ির কাছেই রয়েছে তাঁর প্রসিদ্ধ তেলেভাজার দোকান। প্রতিদিন দুপুর ৩টে নাগাদ দোকান খোলা হয়। তার পর থেকে পরিবারের সকলে মিলে দোকান চালান। দোকানের এক ধারে বসে গ্যাসের আঁচে গরম তেলের কড়াইয়ে ফুলুড়ি, সিঙ্গারা, ভেজিটেবিল চপ, আলুর চপ— সব কিছুই নিজের হাতে ভাজেন হিমাংশু। এছাড়া ঘুগনি এবং রসোগোল্লা, পান্তুয়া, ল্যাংচা, মাখা সন্দেশও বিক্রির জন্য তিনি তৈরি করেন নিজেই। তবে চপ বিক্রিই তাঁর মূল ব্যবসা। দোকান খোলার কিছু সময় পর থেকেই ক্রেতাদের ভিড় বাড়তে শুরু করে। ক্রেতাদের সামলান হিমাংশুর স্ত্রী বন্দনা, ছেলে কাশীনাথ ও পুত্রবধূ শম্পা। এর পর রাত ৯টা পর্যন্ত কেউ দম ফেলার ফুরসতটুকু পান না।
কিন্তু এমন জনপ্রিয়তা কেন? হিমাংশু জানাচ্ছেন, প্রথমত তাঁর দোকানের তেলেভাজার গুণগত মান এবং স্বাদ। দ্বিতীয়ত চপের দাম আজও ১ টাকা। কিন্তু এই অগ্নিমূল্যের বাজারে এত কম দামে তেলেভাজা বিক্রির রহস্যটা কোথায়? হিমাংশুর উত্তর, তাঁদের পরিবার এক সময়ে আর্থিক ভাবে অত্যন্ত দুর্বল ছিল। রোজগারের বিকল্প আর কোনও পথ সে ভাবে খুঁজে না পেয়ে তাঁর বাবা বিশ্বনাথ সেন অনেক বছর আগে বাড়ি লাগোয়া জায়গায় চপের দোকান খুলে বসেন। তাঁর বাবা এলাকার মানুষের আর্থিক পরিস্থিতির কথা বিবেচনা করে তখন ৮০ পয়সা পিস চপ বিক্রি শুরু করেছিলেন। এখন তিনি দোকান সামলান। বেশ কয়েক বছর হল তিনি মাত্র ২০ পয়সা দাম বাড়িয়ে ১ টাকা পিস তেলেভাজা বিক্রি করে চলেছেন। শুধু এক প্লেট ঘুগনির দাম ২ টাকা।
হিমাংশু জানান, এলাকার গরিব, নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্তরাই তাঁর দোকানের প্রধান ক্রেতা। এছাড়াও তাঁর সাফল্যের কথা শুনে দূর-দূরান্ত থেকেও অনেকে আসেন। তাঁর কথায়, প্রতিদিন তেলেভাজার জন্য ১০ কেজি বেসন, ১ বস্তা আলু, ৫ কেজি মটর, হাজার টাকার সরষের তেল-সহ অন্যান্য সামগ্রী লাগে। এ জন্য প্রতিদিন তাঁর প্রায় ৩৫০০ টাকা খরচ হয়। আর জিনিস বিক্রি করে প্রতিদিন গড়ে ৭০০ টাকা লাভ হয়। সেই টাকাতেই সংসার চালানোর পাশাপাশি মেয়েকে এমএ, বিএড পড়ানোর পর ধুমধাম করে বিয়ে দিয়েছেন। সেই সঙ্গে পুরোনো বাড়িটি সংস্কারের পাশাপাশি নতুন দোতলা বাড়িও করেছেন। এখন লক্ষ্য নাতি কুশল ও নাতনি কৃত্তিকাকে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করার।
পাঁচড়া গ্রামের বাসিন্দা প্রেমনাথ ঘোষাল বলেন, ‘দেশে এমন অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যেও ১ টাকায় চপ বিক্রি করে হিমাংশু সেন কোন যাদুতে লাভের মুখ দেখছেন সেটাই সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়।’ আর পাঁচড়া গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধান লালু হেমব্রম বলেন, ‘তেলেভাজার দোকান নিয়ে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মন্তব্যকে অনেকে ব্যাঙ্গ করেছিলেন। কিন্তু বাস্তবে হিমাংশু সেন প্রমাণ করে দিয়েছেন, মুখ্যমন্ত্রী ভুল কিছু বলেননি।’ এ সব শুনে হিমাংশুর মন্তব্য, ‘কম টাকায় মানুষকে তেলেভাজা খাইয়ে অধিক বিক্রিই আমার ব্যবসার স্ট্র্যাটেজি।’ এই ‘স্ট্র্যাটেজির’ প্রশংসা করেছেন অর্থনীতির ছাত্র জামালপুরের বিডিও শুভঙ্কর মজুমদারও।

Theonlooker24x7.com সব খবরের নিয়মিত আপডেট পেতে লাইক করুন ফেসবুক পেজ  ফলো করুন টুইটার

Leave a Reply

Your email address will not be published.

scroll to top