উদ্ধার হওয়া প্রাচীন মূর্তি রাখতে চান না গৃহকর্তা, কেন ফেরাতে চাইছেন জানেন?

Polish_20210610_194813806.jpg

প্রদীপ চট্টোপাধ্যায়, বর্ধমান: পুকুরের পাঁক থেকে গত ২৫ মার্চ প্রাচীন মূর্তি উদ্ধার হয়েছিল পূর্ব বর্ধমান জেলার দাঁইহাটের বেড়াগ্রামে। মূর্তিটি পেয়েছিলেন উদয় ঘোষের পরিবার। এই ধরনের দুষ্প্রাপ্য মূর্তি সংরক্ষণের কথা জানিয়েছিলেন গবেষকরা। সেই সময় প্রাচীন এই শিলামূর্তিটি উদ্ধারের জন্য অনেক চেষ্টাও করা হয়েছিল পুলিশ-প্রশাসনের তরফে। কিন্তু তাতে রাজি হয়নি ঘোষ পরিবার। উল্টে বাড়িতে প্রতিষ্ঠা করে পুজো শুরু করেন পরিবারের সদস্যরা। অথচ সেই উদয় ঘোষই এখন বাড়িতে এই মূর্তি রাখতে রাজি নন। প্রশাসনের হাতে তুলে দিতে চাইছেন তিনি।
কিন্তু কী এমন হল যে একেবারে উল্টো পথে হেঁটে এমন সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি। স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, পুকুরে পাঁক তোলার সময় ২৫ মার্চ প্রায় সাড়ে চার ফুটের এই শিলামূর্তিটি উদ্ধার হয়। যা দেখে গবেষকরা জানিয়েছিলেন, এটি প্রায় ১৩০০ বছরের পুরোনো। এবং এটি বৌদ্ধতন্ত্রের দেবী মারীচীর। তাই গুরুত্বের কথা ভেবে মূর্তি সংরক্ষণের কথা বলা হলেও তাতে রাজি হননি পরিবারের লোকজন। কিন্তু মূর্তি প্রতিষ্ঠা করে পুজো শুরু করার পর থেকেই বাড়িতে অঘটন শুরু হয়েছে বলে দাবি তাঁদের। এর পরেই কিছুটা আতঙ্কে রয়েছেন তাঁরা। তাঁদের বিশ্বাস, ঠিক মতো পুজো না হওয়ার কারণেই রুষ্ঠ হয়েছেন দেবী। উদয়ের বক্তব্য, ‘আমার পক্ষে এই মূর্তি বাড়িতে রেখে ঠিক ভাবে পুজো করা সম্ভব হচ্ছে না। তাছাড়া এত দামী মূর্তি বাড়িতে থাকায় চুরির ভয় থাকে সব সময়। পুজোর খরচও চালিয়ে ওঠা যাচ্ছে না। তাই আমি চাই, প্রশাসন মূর্তিটি নিয়ে যাক।’ এদিকে পরিবারের এক সদস্যা বন্দনা ঘোষ বলেন, ‘দেবীর পুজো হয়তো শাস্ত্র মেনে হচ্ছে না। তাই বাড়িতে প্রতিষ্ঠার পর থেকেই একের পর এক অঘটন ঘটছে। মূর্তি প্রতিষ্ঠার পর আমাদের কয়েকটি মোষ মারা যায়। বাসুদেব নামে বাড়ির এক সদস্য ঘরের চাল ছাওয়ানোর সময় পড়ে আহত হয়। এছাড়াও টুকটাক অঘটন লেগেই রয়েছে। তাই আমরাও আর চাই না যে বাড়িতে মূর্তি থাকুক।’

পরিবার সদস্যরা জানিয়েছেন, মূর্তিতে দেবী একটি রথের উপরে দাঁড়িয়ে রয়েছেন। যে রথটি টেনে নিয়ে যাচ্ছে সাতটি বরাহ। মূর্তিটিতে রয়েছে তিনটে মাথা ও আটটি হাত। দেবীর প্রতিটি মুখে আছে তিনটে করে চোখ। তার মধ্যে দেবীর মধ্য মুখটি ’শান্ত ভঙ্গিমায়’ থাকলেও ডান দিকের মুখটি রয়েছে ’ক্রুদ্ধ ভঙ্গিমায়’। আর বাম দিকের মুখাবয়বটি ’বরাহ’ আদলের। দেবী মূর্তির আটটি হাতে রয়েছে সূচ, সুতো, অঙ্কুশ, রজ্জু, তির, ধনুক, বজ্র এবং অশোক গাছের ডাল।দাঁইহাট নিবাসী ইতিহাস ও পুরাতত্ত্ব গবেষক অশেষ কয়াল জানান মূর্তিটি আনুমানিক ১৩০০ বছরের প্রাচীন। গবেষকের দাবি, শাস্ত্র মতে ‘অষ্টভুজাপিতা মারীচী’ নামেই এই দেবী পরিচিত।
তবে বাড়ি কোনও ঘটনা ঘটে থাকলে তার সঙ্গে মূর্তির কোনও যোগ আছে বলে মনে করছেন না ভারতীয় বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদী সমিতির সদস্যরা। তাঁদের বক্তব্য, এটা নিছকই কাকতালীয়। তবে যে কারণেই হোক মূর্তি ফিরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানাচ্ছেন গবেষকরা। তাঁদের বক্তব্য, প্রাচীন এই দুষ্প্রাপ্য মূর্তি সংরক্ষণ হওয়া প্রয়োজন। তবে তাঁদের দাবি, যে এলাকা থেকে মূর্তি উদ্ধার হয় তা সেখানেই কোথাও সরকারি ভাবে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা উচিত। এ প্রসঙ্গে কাটোয়ার বিধায়ক তথা পুর প্রশাসক রবীন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায় বলেন, ‘ওই পরিবারের তরফে মূর্তির কথা বলা হয়েছে। আমরা সেটি মহকুমা গ্রন্থগারের সংগ্রহশালায় রাখার ব্যবস্থা করছি।’

Leave a Reply

Your email address will not be published.

scroll to top