রাজ্যপালের ‘শংসাপত্র’ দেখিয়ে চাকরি দেওয়ার নামে কোটি কোটি টাকা প্রতারণা, ধৃত ৮

Polish_20210707_023011954.jpg

বর্ধমান: রাজ্যপালের দেওয়া ‘শংসাপত্র’ দেখিয়ে চাকরি দেওয়ার নামে রাজ্যের বিভিন্ন জেলার বেকার ছেলে-মেয়েদের সঙ্গে চলছিল কোটি কোটি টাকার প্রতারণা। এক প্রতারিতর দায়ের করা অভিযোগের ভিত্তিতে পূর্ব বর্ধমানের মেমারি থানার পুলিশ গ্রেপ্তার করল প্রতারণা চক্রের আট সদস্যকে। এই ঘটনায় দেবকুমার চট্টোপাধ্যায় নামে এক জনের নাম উঠে আসছে। তাঁর সম্পর্কে খোঁজ শুরু করেছে পুলিশ। প্রতারণা চক্রের জাল বহু দূর বিস্তৃত রয়েছে বলেই তদন্তকারীদের অনুমান। এর মধ্যে দেবকুমারের সঙ্গে বিজেপি নেতাদের ছবি প্রকাশ্যে এসেছে। ফলে বিষয়টার সঙ্গে কোনও রাজনীতিক জড়িত কি না, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।


পুলিশ জানিয়েছে, ধৃতরা হল মিহির কুমার দাস, আলি হোসেন, হাসিবুল রহমান, আবুল বাসদ, রিয়াজুল ইসলাম, ইব্রাহিম শেখ, শামসুল আলম ও মলয় কর্মকার। ধৃতদের মধ্যে প্রথম ছ’জন মুর্শিদাবাদ জেলার বাসিন্দা। বাকিদের মধ্যে শামসুল বীরভূম জেলার নলহাটি থানার গোপালচক ও মলয় কর্মকার হুগলির সিঙ্গুর থানার জগৎনগরের বাসিন্দা। পুলিশের দাবি, ধৃতদের কাছ থেকে উদ্ধার হয়েছে সাতটি মোবাইল, তিনটি পেনড্রাইভ, সাতটি স্ট্যাম্প, অশোকস্তম্ভ দেওয়া বেশ কিছু নথিপত্র ও ফর্ম, কয়েকটি রেজিস্টার, ১ লক্ষ ১০ হাজার ৫০০ টাকা, সংবাদপত্রে দেওয়া বিজ্ঞাপনের কপি এবং একটি দামি চারচাকা গাড়ি। এ ছাড়াও উচ্চপদস্থ আধিকারিকদের কাছে পাঠানো চিঠি, পথ-সুরক্ষা নিয়ে রাজ্যপালের শংসাপত্র উদ্ধার হয়েছে বলে পুলিশ দাবি করেছে। এই শংসাপত্রগুলি আসল কি না, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। প্রতারণার একাধিক ধারায় মামলা রুজু করে পুলিশ মঙ্গলবার ধৃতদের বর্ধমান আদালতে পেশ করে। প্রতারণা চক্রে জড়িত বাকিদের হদিশ পেতে ও তদন্তের প্রয়োজনে ধৃতদের মধ্যে মিহির দাস, আবুল বাসার ও মলয় কর্মকারকে সাত দিন হেফাজতে চেয়ে আদালতে আবেদন জানান তদন্তকারী অফিসার। সিজেএম তিন ধৃতের পাঁচ দিন পুলিশি হেফাজত ও বাকিদের জেল হেফাজতে পাঠানোর নির্দেশ দেন। অভিযুক্তদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন প্রতারিত চাকরিপ্রার্থীরা।
‘পথ সুরক্ষা’র প্রশিক্ষণ দিয়ে প্রায় তিন হাজার বেকার যুবক-যুবতীয় কাছে একটি সংস্থার নাম করে প্রাতারকরা কয়েক কোটি টাকা তুলেছে বলে অভিযোগ। মঙ্গলবার জেলার মেমারির পালসিটের একটি ধাবাতে প্রশিক্ষণ নেওয়া কর্মপ্রার্থীদের ‘শপথ পত্রে’ সই করাতে আসে প্রতারক দলটি। মেমারির কানাইডাঙার বাসিন্দা এক যুবক প্রতারকদের বিষয়ে এদিনই মেমারি থানায় অভিযোগ জানান। এর পরেই মেমারি থানায় ওসি দেবাশিস নাগের নেতৃত্বে পুলিশ বাহিনী রাতে ওই ধাবায় হানা দিয়ে আট জনকে গ্রেপ্তার করে। পুলিশের দাবি, ‘শপথ পত্রে’ সই করানোর নামে ৩ হাজার টাকা করে বেকারদের কাছ থেকে তোলা হচ্ছে, এমন অভিযোগ পেয়েই পুলিশ ধাবায় হানা দিয়ে চক্রটিকে ধরে। মেমারি থানার পুলিশ জানিয়েছে ,পালসিটের ওই ধাবায় হাজির হয়েছিলেন ৩৩ জন কর্মপ্রার্থী। তাঁরা মূলত পূর্ব বর্ধমান, পশ্চিম বর্ধমান, বীরভূম, হুগলি জেলার বাসিন্দা।


মেমারির ওই অভিযোগকারী জানিয়েছেন, ২০১৮ সালের জানুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহে শক্তিগড়ের সামন্তীর বাসিন্দা এক জনের মাধ্যমে তাঁর মুর্শিদাবাদের নবগ্রামের মিহির কুমার দাসের পরিচয় হয়। ওই ব্যক্তির সঙ্গেই তারকেশ্বরের মহেশপুরের বিনয় কুমার মালিকের কাছে গিয়ে তিনি কেন্দ্র সরকারের চাকরির আশায় ৫৫ হাজার টাকা দেন। তাঁদের গ্রামের আরও কোন কোন কর্মপ্রার্থী কত টাকা চাকরির জন্য দিয়েছেন তাও তিনি পুলিশকে লিখিত ভাবে জানিয়েছেন। ওই যুবক জানিয়েছে, ২০১৭ সাল থেকে এই চক্রটি চলছে। এবং কারও যাতে সন্দেহ না হয় তার জন্য রাজ্যপালের দেওয়া সার্টিফিকেট ও কেন্দ্রীয় সরকারের নানা নথির পাশাপাশি সংবাদপত্রে দেওয়া বিজ্ঞাপন দেখাত প্রতারকরা। এমনকী কলকার বাইপাসের ধারে একটি হাসপাতালে মেডিক্যাল টেস্টও করানো হত। এরপর বারাসাতে তিন দিনের প্রশিক্ষণও দেওয়া হয়। এদিন প্রতারিতদের কাছে তথ্য পাওয়ার পর হুগলির তারকেশ্বরের অফিসেও তল্লাশি চালায় পুলিশ।
পূর্ব বর্ধমান জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার কল্যাণ সিংহরায় জানিয়েছেন, ‘ধৃতদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ করে জানা গিয়েছে, তাঁদের হেড অফিস কলকাতার নিমতা থানার বিরাটিতে। জনৈক দেবকুমার চট্টোপাধ্যায় হচ্ছেন সংস্থার প্রধান। ধৃতদের হেফাজতে নিয়ে বিস্তারিত খতিয়ে দেখা হচ্ছে।’

Leave a Reply

Your email address will not be published.

scroll to top